বুকে আগুন লইয়া নামিয়াছিলাম মাঠে,
স্বপ্ন ছিল চেয়ারম্যান হইব এই হাটে।
সেবার দীপ জ্বালাইব ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায়,
জনতার কণ্ঠস্বর হইব এই ছিল সাধায়।
কিন্তু মাঠে নামিয়া দেখিলাম ভিন্ন খেলা,
নোটের বন্যায় ভাসিতেছে ভোরের বেলা।
এক হাতে প্রতিশ্রুতি, অন্য হাতে থলি ভরা,
আমি দাঁড়াইয়া একা শুধু সততার ভরা।
চারিদিকে হাঁকডাক, মিছিলের শোরগোল,
টাকার ঝনঝনানিতে কাঁপিতেছে ভূমণ্ডল।
আমার কাছে আছে শুধু বুকভরা বিশ্বাস,
কিন্তু বিশ্বাস দিয়া কি ভরে কাহারো পিয়াস?
—
উদ্বিগ্ন হইয়া ভাবিলাম ধরিব জ্ঞানের আলো,
গণশিক্ষার মশাল জ্বালাইয়া করিব সবার ভালো।
জনতার দ্বারে গিয়া বলিলাম সগর্বে,
“শিক্ষার আলো ছড়াইব তোমাদের পর্বে!”
লোকে হাততালি দিল, মাথা নাড়াইল হাসিয়া,
“বাহ্ বাহ্! চমৎকার!” — বলিল মুগ্ধ হইয়া।
বিনা পয়সায় যাহা মেলে তাহা সকলেই চায়,
কিন্তু ভোটের সকালে কথা পাল্টাইয়া যায়।
“ভালো কথা শুনিতে ভালো লাগে ঠিকই ভাই,
কিন্তু বিনি পয়সায় ভোট চাহিয়া লজ্জা দিও না আই।”
এই কথা শুনিয়া, বুকে বিধিল তীর,
সততার মূল্য এখানে কানাকড়িরও নাই ভিড়।
—
গালিবের মতো লোকে বিষ খাইয়াছে জানিয়া,
যখন বাঁচিতে চাইবে — কান্নায় বুক যাবে ভাসিয়া।
কিন্তু উদ্ধারের বেলা অনেক আগেই গিয়াছে,
বিষের শিকড় রক্তের গভীরে বাড়িয়াছে।
খারাপকে কেন বরণ করিল এই জাতি?
তরুণের সংখ্যা কম, বিবেকের নাই বাতি।
অধিকাংশের থলি শূন্য, দু’আনার ও জোর নাই,
তাই যে নোট বাড়াইয়া দেয়, তাহারেই বুকে ঠাঁই।
—
যাহারা ছিল পাশে দীর্ঘ দিনের সঙ্গী,
তাহারাও আজ সরিয়া গেল হইয়া বিরাগী।
বলিল মুখ ফিরাইয়া, কণ্ঠে শীতল সুর —
“বিনি পয়সায় এ পথে চলা সম্ভব নয় দূর।”
“প্রবাস হইতে আসিতে পারেন বড় ভাই,
তিনি যদি আটকান — তাহলে আর কিছু নাই।
তবু ভাবিয়া দেখো একবার, হতাশ হইও না,
বয়স তো হয় নাই তোমার — স্বপ্ন ছাড়িও না।”
“পরের বার হইলে হয়তো থাকিবে কাঁচা পয়সা,
তখন কিনিতে পারিবে সম্মান, ভাঙিবে এই আশা।
দেশসেবা তো শুধুই মুখোশ — জানো না কি ভাই?
আসলে দেশটা চিরিয়া খাওয়ার দান্দা চলে সদাই।”
—
শুনিলাম, বুঝিলাম — তবু মনে মানিল না,
এই যুগের এই সত্য কি কিছুতেই টানিল না?
মুখোশধারীরা নামে সেবার বুলি কপচাইয়া,
ভেতরে ভেতরে লুটে যায় সব গোগ্রাসে গিলিয়া।
জনতার ঘাম রক্ত দিয়া গড়ে নিজের ভাণ্ডার,
সেবকের আসনে বসিয়া হয় সে নিজেই সরদার।
প্রতিটি প্রতিশ্রুতি তাহার শুধুই ফাঁকা শব্দ,
প্রতিটি হাসির আড়ালে লুকানো গভীর দ্বন্দ্ব।
—
এমন নহে যে ভোটাররা কিছুই বোঝে না,
তাহারা জানে — বরং আরো বেশি, অবহেলে না।
বিস্ময়ের এইখানেই — জানিয়া বুঝিয়া তবু,
নিজের হাতে নিজের ভবিষ্যৎ করে তছনছ সবু।
চোখ থাকিতে অন্ধ সাজে, কান থাকিতে বধির,
বিবেক থাকিতে বিকাইয়া দেয় — এই তো আজব ঘির।
যে জাতি নিজেকে রক্ষা করিতে উঠিয়া দাঁড়ায় না,
আল্লাহও সেই জাতিকে কখনো রক্ষা করেন না।
পরিবর্তন আসে না আকাশ হইতে ঝরিয়া,
আসে মানুষের বুকের ভেতর হইতে জ্বলিয়া।
—
তবু বলি — শোনো আরেকবার, ওহে এই সমাজ,
সততার মূল্য দিতে শেখো, আজ না হয় কাজ।
লক্ষ্মীর ভাগাড় লইয়া আসিলে পথ মেলে,
বয়স, যোগ্যতা, চরিত্র সব যায় তলিয়ে।
কিন্তু সেই পথে যাইব না — এই প্রতিজ্ঞা রহিল,
এক টুকরো বিবেক লইয়া এই মাটিতে জন্মিল।
হয়তো এবার জিতিব না, হয়তো থাকিব একা,
তবু ইতিহাসের পাতায় থাকুক সৎ মানুষের রেখা।
—
যে মাটিতে সৎ মানুষ নির্বাচনে যায় হারিয়া,
সেই মাটিতে প্রতিদিন ক্রন্দনধ্বনি বেড়ায় ভাসিয়া।
বুঝিবে যখন খুঁজিয়া পাইবে না তখন —
কেননা সততাকে তুমি নিজে দিয়েছো বিদায়।