যে পল্টন-প্রেস ক্লাব এলাকায় কথায় কথায় লাল পতাকা নিয়ে রাস্তা দখল করে বিভিন্ন ইস্যুতে গর্জে ওঠে বামপন্থি দলগুলো, সেই ঢাকা-৮ আসনে গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাস্তে ও কাঁচি মিলে সাকুল্যে ভোট পেয়েছে মাত্র ৮০০। এর মধ্যে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) প্রার্থী এ এইচ এম রফিকুজ্জামান আকন্দ কাঁচি মার্কায় লড়ে পেয়েছেন মাত্র ৯৬ ভোট। আর সিপিবির প্রার্থী ত্রিদীপ কুমার সাহার কাস্তে পেয়েছে ৭১৪ ভোট। দুজনেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই জোটে বিভক্ত হয়ে বামপন্থি দলগুলো মোট ১৮২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এর মধ্যে ১৮০টিতেই তাদের প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে বাম দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের হার মাত্র ০.৩৬ শতাংশ।
বিএনপির বাইরে ১০ বাম দলের জোট 'গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট' ১৪৭টি আসনে নির্বাচন করে। এদের মধ্যে সিপিবি ৬৩ আসনে ০.০৮ শতাংশ, বাসদ ৩৬ আসনে ০.০৫ শতাংশ, বাসদ (মার্কসবাদী) ৩৩ আসনে ০.০২ শতাংশ এবং বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ১৫ আসনে ০.০২ শতাংশ ভোট পায়। সব মিলিয়ে এই জোটের প্রাপ্ত ভোট ০.১৭ শতাংশ।
বিএনপির সঙ্গে থাকা তিনটি বামঘরানার দল — নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলন — মোট ৩৫ জন প্রার্থীর মধ্যে কেবল গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে জয় পান। অন্যরা কেউ জামানত রক্ষা করতে পারেননি।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল চারটি — সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ। মোট ৯৭টি আসনে জোটের ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল।
শ্রমিক এলাকায়ও একই হাল
শ্রমিকদের মধ্যে বামদের প্রভাব বিস্তর বলে দাবি করা হলেও সেই শ্রমিক অধ্যুষিত গাজীপুর-২ (টঙ্গী ও গাজীপুর সদর) আসনেও চিত্র হতাশাজনক। সেখানে কাঁচি প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ২৫০ ভোট আর কাস্তে পেয়েছে ১,৩৯৭ ভোট।
সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন নরসিংদী-৪ আসনে লড়ে পেয়েছেন মাত্র ৮৩৯ ভোট। সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফী রতনও কুমিল্লা-৫ আসনে জামানত হারিয়েছেন।
ঐতিহাসিক পতনের রেখাচিত্র
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ১৯৯১ সালে সিপিবি পেয়েছিল ৪ লাখ ৭ হাজার ৫১৫ ভোট, মোট ভোটের ১.১৯ শতাংশ এবং ৫টি আসন। ১৯৯৬ সালে তা নেমে আসে ৪৮ হাজার ৫৪৯ ভোটে। ২০০১ সালে ৫৬ হাজার ৯৯১ ভোট পেলেও আসন শূন্য। আর এবার ২০২৬ সালে সিপিবির প্রাপ্তি মাত্র ০.০৮ শতাংশ ভোট, আসন শূন্য। ৭৮ বছরের পুরনো দলটির এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতন।
পতনের কারণ: বিশ্লেষকদের মত
রাজনীতি বিশ্লেষক চিররঞ্জন সরকার বলেন, বাম দলগুলোর ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ার প্রধান কারণ হলো সাংগঠনিক বিচ্ছিন্নতা ও বিভাজন। একই আদর্শে বিশ্বাসী হয়েও বিভিন্ন বাম দল ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে শক্তিশালী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনীতি ও ভাষাকে আধুনিক করতে না পারাও বড় ব্যর্থতা।
বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, ক্ষমতার লেজুড়বৃত্তি বামদের আত্মাহুতির অন্যতম কারণ। আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোটে থেকে ক্ষমতার হালুয়া-রুটির পেছনে দৌড়ানো, ইসলামবিদ্বেষী অবস্থান, ভারত তোষণ এবং নেতাদের ব্যক্তিজীবনে বিলাসিতা ও দুর্নীতি — সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা সম্পূর্ণ হারিয়েছে বামপন্থিরা।
সিপিবি নেতার স্বীকারোক্তি
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হাসান প্রিন্স স্বীকার করেন, ভোটের রাজনীতিতে তাদের দুর্বলতা রয়েছে। তিনি বলেন, দ্বিদলীয় রাজনীতির চাপে বাম দলগুলো নিজস্ব অবস্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। আরও মানুষের কাছে গিয়ে তাদের ভরসার স্থল হয়ে উঠতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোটার ভোট দেন। এই নির্বাচনে বাম রাজনীতির যে চূড়ান্ত ভরাডুবি হয়েছে, তা কেবল সংখ্যার হিসাবেই নয় — এটি একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের অস্তিত্ব সংকটের প্রকাশ। বিভাজন, লেজুড়বৃত্তি, আদর্শচ্যুতি এবং জনবিচ্ছিন্নতা মিলিয়ে বাংলাদেশের বাম রাজনীতি আজ কার্যত ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেওয়ার পথে।