প্রচ্ছদ জাতীয় আন্তর্জাতিক অর্থনীতি প্রযুক্তি মতামত

বিটল্‌সের জর্জ হ্যারিসন যেভাবে হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের

সূত্র: দ্য ডেল্টা লেন্স | প্রকাশ: মার্চ ১৭, ২০২৬, ১৮:৩৫
বিটল্‌সের জর্জ হ্যারিসন যেভাবে হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের

৭০-এর দশকের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটল্‌স এর গিটারিস্ট জর্জ হ্যারিসন তার বন্ধু ভারতের কিংবদন্তী সেতার বাদক রবিশঙ্করের সাথে বসে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর পরিকল্পনা করে ফেললেন। ভারতীয় হওয়ায় রবিশঙ্কর বাংলাদেশে চলমান অস্থিরতা সহজেই অনুভব করতে পেরেছিলেন। শ'য়ে শ'য়ে উদবাস্তু, অভুক্ত মানুষ, দুর্দশায়-দুর্ভিক্ষে নিপীড়িত মানুষ,যুদ্ধ-বিগ্রহ-অশান্তির মাঝে দু'মুঠো ভাতের আশায় অপেক্ষারত মানুষ- রবিশঙ্করের খুব পরিচিত দৃশ্য। তাই সে সংকট সহজেই হৃদয় দিয়ে ধারণ করতে পারলেন তিনি। কিন্তু সুদূর ব্রিটেনে বড় হওয়া একজন ইংরেজ সংগীতশিল্পী জর্জ তা বুঝবে কি করে! তবু কেবল মানবিক তাগাদা থেকেই বন্ধু জর্জকে বাংলাদেশের চলতি টানাপোড়েনের কথা বললেন রবিশঙ্কর। চাইলেন নামমাত্র সাহায্য। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে জর্জ হ্যারিসন শুধু রাজিই হলেন না, নিজেই লিখে ফেললেন "বাংলাদেশ" শিরোনামে একটি সম্পূর্ণ গান।

তখন সবে সবে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা বিটল্‌স ভেঙেছে। কিন্তু নিজের  'All Things Must Pass' অ্যালবামের সুবাদে হ্যারিসনের একক ক্যারিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তাই গ্লোবাল পপ কালচারের সবচেয়ে আলোচিত মুখ হবার স্টারডমটাই কাজে লাগালেন তিনি। অথচ কোনো প্রয়োজন ছিলোনা। তার জনপ্রিয়তা ইতোমধ্যে আকাশ ছুঁয়েছে, জাত চেনানোর বাধ্যবাধকতা নেই,নেই ব্যতিক্রমী শিরোনামে আশার প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু রবিশঙ্কর প্রস্তাবনা রাখার সাথে সাথেই তাতে উঠে পড়ে লাগলেন জর্জ হ্যারিসন। কেন?

কারণ তার কাছে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ ছিলো শিল্পস্বত্তাকে অর্থপূর্ণ করে তোলার একটি প্রচেষ্টা। তাই কেবল শিল্পী হয়ে নয়, মাঠে নেমে পড়লেন আয়োজকের ভূমিকা পালন করতে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো যোগাড়যন্তে। ইচ্ছে আছে,আয়োজন আছে কিন্তু শিল্পী কই? কাদের নিয়ে মঞ্চে উঠবেন হ্যারিসন? ফিরে যেতে হলো সেই বিটল্‌সের কাছেই। একে একে রিঙ্গো স্টার,জন লেনন,পল ম্যাককার্টনিকে ফোন দিলেন তিনি। কিন্তু যে দল ভেঙে গেছে তাই নিয়ে স্টেজে উঠলে যে পুণর্মিলনীর ইঙ্গিত দেয় সেটা, তাই একে একে না করে দিতে থাকলেন জর্জ হ্যারিসনকে। কিন্তু নাছোড়বান্দা হ্যারিসন তবু শিল্পী যোগাড় করেি ছাড়লেন। মঞ্চে উঠলেন বব ডিলান,এরিক ক্ল্যাপটন,লিওন রাসেল,বিলি প্রেস্টনকে নিয়ে। সাথে রবিশঙ্কর ও তার সঙ্গীরা তো আছেনই।

একদিকে ক্ষুধার্ত,আশ্রয়হীন শরনার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে ভারতে অন্যদিকে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এর প্রস্তুতি নিচ্ছে একঝাঁক শিল্পী, সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে। শিল্পী জোগাড় হয়েছে,পরিকল্পনা সব রেডি কিন্তু এখন কোথায় এবং কখন হবে এই আয়োজন- তা ঠিকঠাক না করে ঘোষণা দেয়া যায় না। আবার হুটহাট যেনতেন দিনে তো এই বিশাল আয়োজন করা যায়না,তাই শিল্পীরা ছুটলেন জ্যোতিষীর কাছে। একজন ভারতীয় জ্যোতিষীর পরামর্শে বেছে নেওয়া হলো আগস্ট মাস। এদিকে আরেক যন্ত্রণা। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে পুরো আগস্ট মাসের শুধু ১ তারিখই খালি। তবে আর কি করা। সেদিনই নির্ধারিত করা হলো কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এর জন্যে। হ্যারিসন আগেই একক সিঙ্গেল 'Bangla Desh' রেকর্ড করে রেখেছিলেন,তারপর রবিশঙ্করের 'Joi Bangla' বেনিফিট রেকর্ড প্রডিউস করেন। অতঃপর ইউনিসেফের সঙ্গে মিলে খোলা হয় 'George Harrison–Ravi Shankar Special Emergency Relief Fund'।

যদিও রবিশঙ্করের ধারণা ছিলো এই কনসার্ট থেকে খুব বেশি হলে ২০-২৫হাজার ডলার ওঠানো সম্ভব হবে,কিন্তু অবাক ব্যাপার কেবল টিকিট বের হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় ৪০হাজার টিকিট বিক্রী হয়ে যায়।এমন অভাবনীয় সাড়া পেয়ে শিল্পীরা সিদ্ধান্ত নেন একইদিনে দুটি শো করার।একটি বিকাল আড়াইটায় ও আরেকটি রাত আটটায়।দুই শো মিলিয়ে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেয় যে তা সে সময় বেনিফিট কনসার্টের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন।​কনসার্টের টিকিট বিক্রি থেকেই প্রায় ২.৪–২.৫ লাখ মার্কিন ডলার তোলা হয়, যা হ্যারিসন ইউনিসেফের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের পক্ষে দান করেন এবং সে সময়কার প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধিদের হাতেও অর্থ পৌঁছায় বলে উল্লেখ রয়েছে।পরবর্তী সময়ে কনসার্টের লাইভ রেকর্ড অ্যালবাম আর চলচ্চিত্র বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হয়; সব মিলিয়ে আনুমানিক ১২ মিলিয়ন ডলারের মতো তহবিল গড়ে ওঠে।

মঞ্চে প্রথম পর্ব ছিল ভারতীয় ধ্রুপ ও ফোক-নির্ভর 'বাংলা ধুন'—রবিশঙ্করের সেতার, আলী আকবর খাঁর সরোদ, আল্লা রাখার তবলা আর কমলা চক্রবর্তীর তানপুরা মিলে বাংলাদেশের এক সুরেলা প্রতিচ্ছবি এঁকে দেয়,যা পশ্চিমা শ্রোতাদের এক বড় অংশের কাছে ছিল প্রথম ভারতীয় ক্লাসিক্যাল লাইভ অভিজ্ঞতা।পরে হ্যারিসন একে একে পরিবেশন করেন 'Wah-Wah', 'Something', 'While My Guitar Gently Weeps'সহ নিজের জনপ্রিয় গান। আর শেষ অংকে হ্যারিসন তার লেখা 'Bangla Desh' গেয়ে পুরো আয়োজনের মানবিক বার্তা স্পষ্ট করে তোলেন।​

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে পরিচিতি না পেলে জর্জ হ্যারিসনের ক্যারিয়ারে কি কোনো প্রভাব পড়তো?পড়তো না।জর্জ হ্যারিসনের কনসার্ট ফর বাংলাদেশ কি পরিচিতি পাবার প্রচেষ্টা ছিলো?ছিলোনা। তাই সেই সমীকরণে যাবার কোনো অর্থ নেই।কিন্তু বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটি দরিদ্র দেশের জন্য কিভাবে আটঘাট বেঁধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন বিশ্ববিখ্যাত পপতারকা জর্জ হ্যারিসন তা এক ভাববার বিষয় বটে! কেবল মানবিক আবেদন থেকে হ্যারিসন এ কাজটি করলেও বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের অকৃত্রিম ভালোবাসা। আজ, ২৯শে নভেম্বর, বাংলাদেশের এই পরম বন্ধুর ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ফুসফুসের ক্যান্সারে তিনি মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু আজও বেঁচে আছেন বিশ্বজুড়ে তাঁর ভক্তদের হৃদয়ে। এভাবেই বোধহয় প্রকৃতি তার প্রিয় মানুষগুলোকে স্বল্পসময়ের মধ্যে কেড়ে নিয়ে, অমর করে রাখে এই পৃথিবীর বুকে।