প্রচ্ছদ জাতীয় আন্তর্জাতিক অর্থনীতি প্রযুক্তি মতামত
জাতীয় / খবর

বিপ্লব, বিদ্রোহ আর ভালোবাসার আজম খান

সূত্র: দ্য ডেল্টা লেন্স | প্রকাশ: মার্চ ১৭, ২০২৬, ১৮:৪০
বিপ্লব, বিদ্রোহ আর ভালোবাসার আজম খান

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়। ঢাকার ড্রয়িংরুমগুলোতে তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ধ্রুপদী সুরের আধিপত্য। গান মানেই তখন পরিশীলিত শব্দচয়ন আর মার্জিত সুরের এক 'ভদ্রলোকী' আবেশ। এই অঞ্চলের জনমানসের প্রতিচ্ছবি তখনও গেঁয়ো ট্যাগ খেয়ে জাতে উঠতে পারছে না। এমনই সময় এক গায়ক মঞ্চে উঠলেন। দাদাবাবুদের কাছ থেকে ধার করা কেতাদুরস্ততার গালে সপাটে এক চড় বসিয়ে গান রচনা করে বসলেন বস্তির এক ছেলেকে নিয়ে। এই অঞ্চলের ভাষা, এই অঞ্চলের নিজস্ব স্ট্রাগল- এই দুইয়ের সংমিশ্রণে তখনকার সদ্য স্বাধীন এই রাষ্ট্রের সত্য অবস্থান ফুটিয়ে তুলছেন তিনি। আর তার আঘাতটা গিয়ে লাগছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন দেখানো সোনার বাংলার বাস্তবতায়। ফলাফল? কি আর হবে, লম্বা চুলওয়ালা এই গায়কীর ঘাড় ধরে নামানো হলো বিটিভির পর্দা থেকে। কিন্তু তাতে কি? ততোদিনে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে তার নাম- আজম খান। ফিরছে তার গান- "রেললাইনের ওই বস্তিতে, জন্মেছিল একটি ছেলে..."

তৎকালীন এলিট সংগীতজগতে গানের সাবজেক্ট হওয়ার মর্যাদা পেতো প্রেম, বিরহ কিংবা প্রকৃতি। আজম খান সেই কাঠামো ভেঙে তার গানের বিষয়বস্তু তুলে নিলেন ঢাকার অলিগলি, ধুলোবালি থেকে। নিজেদের কথা, অকৃত্রিম বাস্তবতা আর গাইতে সহজ হওয়ায় তার গানগুলো ছড়িয়ে পড়লো এদেশের খেটে খাওয়া জনমানুষের ড্রয়িংরুম থেকে আড্ডা আয়োজনে। ফলে যা আগে ছিল কেবল 'নিচু শ্রেণির' ভাষা, গিটারের টানে তা-ই হয়ে উঠল গোটা প্রজন্মের বিদ্রোহের ভাষা।

স্বভাবতই যা ছিলো নীতিনির্ধারকদের কাছে অস্বস্তির সূক্ষ্মরেখা। তবে কেবলই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ না হওয়ায় আজম খানকে দমানো ছিলো শক্ত। যতোই বঙ্গবন্ধু স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান, এই আজম খানই যুদ্ধের ময়দানে লড়ে এসেছেন মুজিবপুত্র শেখ কামালের সাথে, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পুত্র রুমীর সাথে। তাই তার গ্রহণযোগ্যতাকে যেকোনো মূল্যে অসাড় প্রমাণ করা যায়না। এদিকে নিজগুণে ক্রমাগত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন আজম খান। কখনো লুঙ্গি পরেই নিজ ব্যান্ড নিয়ে মঞ্চে উঠে যান, কখনো সাতারু হয়ে সাতার শেখান জাতীয় সাতারুদের, কখনো প্রথম বিভাগের ক্রিকেটার হয়ে স্টেডিয়াম মাতান, কখনোবা অভিনেতা হয়ে মাতান হলমুখী দর্শকদের। বহুমাত্রিক পরিচয়ের এই শিল্পীর মূল শক্তিই ছিলো তার অকৃত্রিমতা। শিল্পবোদ্ধা হয়ে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা ছিলোনা তার কখনোই। বরং সংক্ষিপ্ত এই জীবনকে পুরোপুরি উপভোগ করতে চেয়েছিলেন তিনি। সত্য দিয়ে ধারণ করতে চেয়েছিলেন সাধারণকে। তাই স্বাধীন এই দেশে, মুজিব থেকে জিয়া আর জিয়া থেকে এরশাদ- সময়ে সময়ে সকল সরকারেরই চক্ষুশূল হতে হয়েছে তাকে। কখনো এক বিপথগামী যুবক হিসেবে, কখনোবা বিপজ্জনক আইকন হিসেবে। আশির দশকে এরশাদের ইসলামীকরণের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রায় বন্ধ করে দেওয়ায় আজম খানের কনসার্টের সুযোগ সংকুচিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে অন্তরালে চলে যেতে থাকেন সাধারণের এই অসাধারণ গায়ক। কিন্তু জীবন্ত প্রতিবাদের এই প্রান্তিক কন্ঠস্বরকে বারবার রাষ্ট্রীয় কোপানলে ফেলেও পুরোপুরি মুছে ফেলা যায়নি কখনোই। সময়ে সময়ে রিক্সাওয়ালা থেকে কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ সকলের মুখেই ফিরতে শোনা গেছে আজম খানকে, কখনো পাপড়িকে বোঝানোর আকুতিতে, কখনো ফেলে আসা দিনগুলোর পিছু ডাকে, এই আজম খানের বাংলাদেশে।